
হাওরে বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিক সংকট নিরসনে যাদুকাটা নদীর বালু মহাল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। নদীতে মাইকিং করে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের আহ্বানও জানানো হয়। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল নদীতে টহল জোরদারের জন্য নৌযানের ব্যয় বাবদ এক লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাত নামলেই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সরব হয়ে উঠছে শতাধিক ড্রেজার মেশিন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিটি ড্রেজার থেকে প্রতি রাতে ৩০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। একটি প্রভাবশালী মহলের কাছে এই অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয় বলেও দাবি তাদের। ক্ষুব্ধ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ বাণিজ্য চলছে। যদিও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ধান কাটার স্বার্থে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতেই তারা শ্রমিকদের উৎসাহিত করছেন এবং পাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় উত্তোলিত বালু স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে সেখান থেকে বড় স্টিলবডি নৌযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার পক্ষের প্রতিনিধিরাও ওই বালু থেকে রয়্যালটি আদায় করছেন। মিয়ারচর গ্রামের ইকরাম ও সুমন মিয়াসহ কয়েকজন ব্যক্তি সরাসরি টাকা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের দাবি। যদিও সুমন মিয়া নিজেকে এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিয়ারচরের এক বাসিন্দা বলেন, “দিনে নদী বন্ধ থাকে, কিন্তু রাত হলেই অন্তত একশ’ ড্রেজার চালু হয়। প্রতিটি ড্রেজার থেকে ৩০ হাজার টাকা তোলা হয়। যারা টাকা তোলে তারা নিয়মিত আসে, পুরো বিষয়টি উপজেলা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হওয়ার পর গত তিন দিন ধরে ড্রেজারের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল আওয়ালও দাবি করেন, কয়েকদিন ধরে ড্রেজারের উৎপাত কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক ও পুলিশের হয়ে কিছু ব্যক্তি টাকা তুলছে বলে শুনেছেন। তবে ঝামেলার আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানান।
জেলার সবচেয়ে বড় বালু মহাল হিসেবে পরিচিত যাদুকাটা নদীর ইজারার মেয়াদ নিয়ে রয়েছে আইনি জটিলতা। ইজারাদারদের দাবি, উচ্চ আদালতের নির্দেশে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা ভোগদখলে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল জানান, প্রশাসন ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে এবং শুনানির পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এদিকে সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি একেএম আবু নাসার বলেন, “যাদুকাটা নদীতে আর স্বাভাবিক বালু নেই, এখন পাড় কেটে বালু নেওয়া হচ্ছে। দিন-রাত ড্রেজার চলায় নদীর তীর ভেঙে অনেক এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।” পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে, বাড়াচ্ছে ভাঙনের ঝুঁকি এবং ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র্য।
যাদুকাটা নদীর ইজারাদার ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির মিয়া দাবি করেন, শ্রমিক সংকটের কারণে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে এবং তাদের পক্ষ থেকে কোনো রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে না। তবে তাহিরপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, রাতে নদীতে কোনো ড্রেজার চলে না এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
সদ্য যোগদান করা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, রাতে ড্রেজার চলার খবর পেয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি অবৈধ কার্যক্রম চলতে থাকে, তাহলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, টহল জোরদারের ঘোষণা এবং জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য—সবকিছুর পরও যদি রাতের অন্ধকারে যাদুকাটা নদীজুড়ে ড্রেজারের গর্জন থামানো না যায়, তাহলে এই অবৈধ বালু লুটের নেপথ্যে কারা? নদী বাঁচাতে এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে তাহিরপুরবাসী।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।